ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুত শুল্কজনিত অনিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৫ সাল। চলতি বছরের যেকোনো অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে এ আশঙ্কা প্রাধান্য পাচ্ছে, যা আরেক দফা প্রকাশ পেল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায়। যেখানে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকির প্রতিক্রিয়া এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। কারণ বছরের শুরুতেই দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ খরচ বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া বাড়তি শুল্ক এ বছর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোকে আরো বাড়িয়ে তুলবে।
এফটির এক প্রতিবেদন অনুসারে, গত শুক্রবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিষয়ে সতর্ক করে দেন আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তার মতে, চলতি বছর অর্থনীতিসংক্রান্ত বৈশ্বিক নীতিগুলো ‘বড় ধরনের অনিশ্চয়তার’ মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির বাণিজ্য নীতি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
স্বল্পমেয়াদি সুদহার কমার মতো ইতিবাচক বিষয় উল্লেখ করে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে দীর্ঘমেয়াদি সুদহার বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে এ অনিশ্চয়তা প্রকাশ পাচ্ছে।’
কয়েক দিনের মধ্যে হোয়াইট হাউজে দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার নির্বাচনী প্রচারে শুল্ক বেশ গুরুত্ব পেয়েছে, যাকে তিনি অভিধানের সবচেয়ে প্রিয় শব্দ বলেও উল্লেখ করেছেন। জয়ী হওয়ার পর একাধিকবার শুল্কহার নিয়ে কথাও বলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ২৫ শতাংশ এবং চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার হুমকি দেন ট্রাম্প, যা একটি নতুন বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের যুগের সূচনা করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিবৃতির পর পরই ‘এ যুদ্ধে কেউ জয়ী হবে না’ বলে সতর্ক করে দেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অভিষেকের পর পরই প্রতিশ্রুত শুল্ক তৎক্ষণাৎ আরোপ করবেন বা নির্দিষ্ট খাতকে লক্ষ্য করে পদ্ধতি বেছে নেবেন কিনা, সেদিকে উদ্বেগের সঙ্গে তাকিয়ে আছে এখন মার্কিন মিত্ররা।
বাণিজ্য নীতির পাশাপাশি ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের কর পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার এজেন্ডাসহ বিস্তৃত অর্থনৈতিক নীতির প্রসঙ্গে “বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আগ্রহ’’ রয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোয় আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে। কারণ বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে সংযোগ বেশি হওয়ায় এ দেশগুলোয় বাণিজ্য নীতির প্রভাব বিশেষভাবে পড়বে।’
আগামী সপ্তাহে প্রকাশ হতে যাচ্ছে ২০২৫ সালের জন্য আইএমএফের প্রতিবেদন ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার আলাপ থেকে ওই প্রতিবেদন সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০২৫ সালে ‘স্থিতিশীল থাকবে’।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ ২০২৫ সালের জন্য অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। সেখানেও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সঙ্গে বছরব্যাপী একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে বলে জানানো হয়।
প্রবৃদ্ধি প্রসঙ্গে আইএমএফের এমডি জানান, সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্রের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ‘কিছুটা স্থবির’। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ‘আমাদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক ভালো’ বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করেন তিনি।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন মূল্যস্ফীতির চাপ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে বলে জানান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশগুলো যেকোনো ধরনের নতুন অভিঘাতে খুব নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।’
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানান, প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে আইএমএফ বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন প্রবণতা দেখছে। ভারতে কিছুটা"ধীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে ব্রাজিল কিছুটা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হতে পারে।
কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি বলে উল্লেখ করেন বহুজাতিক সংস্থাটির এ শীর্ষ নির্বাহী। চলতি বছরও সে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তার পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৫ সালেও দেশগুলো কভিডের সময়কালের নেয়া উচ্চ ঋণের সঙ্গে লড়াই করবে এবং সরকারি ঋণকে ‘আরো টেকসই পথে’ নিয়ে যেতে আর্থিক নীতিকে সংহত রাখতে হবে।
বেশকিছু দেশ নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ সরকারি ঋণের জালে আটকে আছে। এ জটিল সমস্যার সমাধান করতে হবে চলতি বছর। ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, ‘জনমতের কারণে আর্থিক নীতিতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া খুব কঠিন প্রমাণিত হয়েছে, যা নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ ঋণের সমাধানে আমাদের তহবিলের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।’
কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে আসা। এক্ষেত্রে অনেক দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। রেকর্ড সময় ধরে সুদহার সর্বোচ্চ স্তরে ধরে রাখার পর গত বছর থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে আনছে মার্কিন আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল রিজার্ভ বা ফেড। বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার আলাপে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ফেডারেল রিজার্ভের লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে এবং সাম্প্রতিক তথ্য একটি শক্তিশালী চাকরির বাজারের চিত্র তুলে ধরেছে। তাই সুদহার পরবর্তী দফায় কাটছাঁটের আগে আরো তথ্যের জন্য অপেক্ষা করতে পারে ফেড। সামগ্রিকভাবে সুদহার ‘বেশ কিছুদিনের জন্য কিছুটা বেশি’ থাকতে পারে।